ঋণ শোধ হলো না, দুটি কফিনে ফিরলেন সৌদি প্রবাসী দুই ভাই
পরিবারের মুখে হাসি ফোটাতে সৌদি আরবে গিয়েছিলেন সজীব ও সুজন। সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়ে দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়া শেষে ফিরলেন নিজ গ্রামে—শেষ হলো পাশাপাশি দুটি কবরের নীরবতায়।

পরিবারের দারিদ্র্য দূর করে ঋণের বোঝা লাঘব করার স্বপ্ন নিয়েই সৌদি আরবে পাড়ি জমিয়েছিলেন লক্ষ্মীপুরের দুই সহোদর ফয়েজ আহমেদ সজীব (২৯) ও ফরহাদ হোসেন সুজন (২১)। কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে সেই স্বপ্ন আর পূরণ হলো না। সৌদি আরবের দাম্মামে ভয়াবহ সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারানোর পর শেষ পর্যন্ত তাঁদের দেশে ফিরতে হলো দুটি কফিনে।
মঙ্গলবার (২৮ জুলাই) সকাল ১০টায় লক্ষ্মীপুরের চন্দ্রগঞ্জ উপজেলার গনিপুর গ্রামের নিজ বাড়িসংলগ্ন কামারহাট মসজিদ মাঠে দুই ভাইয়ের জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। পরে পারিবারিক কবরস্থানে পাশাপাশি দাফন করা হয় তাঁদের। শেষ বিদায়ে আত্মীয়স্বজন, এলাকাবাসী ও শুভাকাঙ্ক্ষীদের কান্নায় ভারী হয়ে ওঠে পুরো এলাকা।
নিহত দুই ভাই চন্দ্রগঞ্জ উপজেলার গনিপুর গ্রামের খলিফার বাড়ির বাসিন্দা আবদুল মালেকের ছেলে। বড় ভাই সজীব দীর্ঘদিন ধরে সৌদি আরবের দাম্মামে খেজুরের ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। চলতি বছরের শুরুতে ছোট ভাই সুজনকে নিজের সঙ্গে কাজের জন্য সৌদি আরবে নিয়ে যান।
পরিবার সূত্রে জানা যায়, গত ১৫ জুলাই রাতে খেজুরবোঝাই একটি পিকআপে করে বাগান থেকে ফেরার পথে তাঁদের গাড়িটি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে সড়কের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা একটি ট্রাক-লরির সঙ্গে সজোরে ধাক্কা খায়। এতে ঘটনাস্থলেই দুই ভাই নিহত হন।
ছেলেদের হারিয়ে বাকরুদ্ধ বাবা আবদুল মালেক বলেন,
“ঋণ করে দুই ছেলেকে সৌদি আরবে পাঠিয়েছিলাম। ভেবেছিলাম তারা পরিশ্রম করে সংসারের অভাব দূর করবে, ঋণ শোধ করবে। কিন্তু সেই ঋণ আর শোধ হলো না। আমার দুই ছেলে আর নেই। এমন দিন দেখতে হবে, কখনো ভাবিনি।”
দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়া শেষে সোমবার রাতে দুই ভাইয়ের মরদেহ গ্রামের বাড়িতে পৌঁছায়। শেষবারের মতো তাঁদের একনজর দেখতে শত শত মানুষ ভিড় করেন। জানাজায় বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ, জনপ্রতিনিধি, স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তি এবং বিপুলসংখ্যক মুসল্লি অংশ নেন।
নিহত সজীবের স্ত্রী ও দুই বছর বয়সী একটি ছেলে রয়েছে। পরিবারের প্রধান দুই উপার্জনক্ষম সদস্যকে হারিয়ে পরিবারটি এখন চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছে।
স্থানীয়দের ভাষ্য, সজীব ও সুজন ছিলেন অত্যন্ত ভদ্র, পরিশ্রমী ও সবার প্রিয়। তাঁদের অকালমৃত্যুতে শুধু একটি পরিবার নয়, শোকের ছায়া নেমে এসেছে পুরো গনিপুর গ্রামে।
চন্দ্রগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) নিলুফা ইয়াসমিন নিপা বলেন,
“একসঙ্গে দুই ভাইয়ের এমন মর্মান্তিক মৃত্যু অত্যন্ত হৃদয়বিদারক। শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জানাই।”





