মৃত প্রবাসীর পরিবার থেকে ঘুষ নেয়ার অভিযোগে সাময়িক বরখাস্ত হলেন মাহবুবুর রহমান।

সৌদি প্রবাসী মৃত বাবুল চৌধুরীর পরিবারের কাছে ৯০ হাজার টাকা ঘুষ নেয়ার অভিযোগে সাময়িক বরখাস্ত হলেন প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের অধীনস্থ ওয়েজ আর্নার্স কল্যান বোর্ডের অফিস সহকারী কাম মুদ্রাক্ষরিক মাহবুবুর রহমান।
সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদে গত বছরের ১৮ আগস্ট হৃদ রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান কুমিল্লা জেলার চৌদ্দগ্রাম থানার নারায়নপুর গ্রামের আতিকুল্লাহ চৌধুরীর ছেলে বাবুল চৌধুরী।
নিয়ম অনুযায়ী মরদেহ দাফনের ৪৫ দিন পর প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের অধীনস্থ ওয়েজ আর্নাস কল্যাণ বোর্ড থেকে মৃত প্রবাসীর পরিবারকে ৩ লাখ টাকা আর্থিক সহায়তা দেয়া হয়,সেই অনুযায়ী বাবুল চৌধুরীর পরিবারকে জানানো হয় ৪৫ দিন পর তারা ও এই টাকা পাবেন ।
সেই অনুযায়ী বাবুল চৌধুরীর পরিবারের পক্ষে মেয়ের জানাই অপু,মাহবুবুর রহমানের সাথে যোগাযোগ করলে তিনি জানান,তারা এই ৩ লাখ টাকা পাবেন না,কারণ হিসেবে বলা হয় বাবুল চৌধুরির ম্যানপাওয়ার কার্ড নেই,এক্ষেত্রে বাবুল চৌধুরী ১৯৯৫ সালে প্রথম যেই পাসপোর্ট দিয়ে সৌদি গিয়েছিলেন সেই পাসপোর্ট টি লাগবে,বাবুল চৌধরি সৌদি আরবে বৈধ কর্মী ছিলেন,তার মরদেহের সাথে যে পাসপোর্ট টি দেশে আসে সেটির ও মেয়াদ রয়েছে প্রায় ১ বছর,একই সাথে সৌদি আরবের বাবুল চৌধুরীর ইকামার মেয়াদ ও ছিল প্রায় ৭ বছর।
এতকিছুর পরে ও মাহবুবুর রহমান বলেন সেই প্রথম পাসপোর্ট জমা না দিলে এই টাকা কোনোভাবেই পাওয়া সম্ভব না,এই পর্যন্ত সব কিছুই ঠিক ছিল।
কিন্তু বিপত্তি বাধে এমন সিদ্ধান্ত জানাননোর কয়েকদিন পর মাহবুবুর রহমান অপুকে ফোন দিয়ে জানান যদি তাকে ৪০ হাজার টাকা দেন তাহলে তিনি এই টাকা পাওয়ার ব্যবস্থা করে দিবেন,এবং টাকা ব্যাংকে জমা হওয়ার পর তাকে আরো ৫০ হাজার টাকা দিতে হবে,এক কোথায় ৯০ হাজার টাকা খরচ করলে তিনি ৩ লক্ষ টাকা পাওয়ার দায়িত্ব দিবেন।
এমন প্রস্তাবের পর ই বাবুল চৌধুরীর মেয়ের জামাই অপু আমাদের সাথে যোগাযোগ করেন,আমরা অভিযোগের সপক্ষে প্রমান চাইলে তিনি আমাদেরকে মাহবুব ও তার মধ্যকার একটি ফোনালাপ পাঠান। সেই ফোন আলাপে অপুর অভিযোগের সত্যতা পাওয়া যায়।
মাহবুবের পরামর্শ অনুযায়ী গত ২২ ডিসেম্বর রবিবার প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ে আসেন বাবুল চৌধুরীর স্ত্রী রওশন আরা বেগম,পুত্র সন্তান হোসেন চৌধুরী,ভাতিজা পাভেল চৌধুরী ও মেয়ের ও জামাই মোস্তাফিজুর রহমান অপু।
সকাল থেকেই আমাদের অনুসন্ধানটি টিম নিয়ে তাদের সাথে যোগ দেই আমরা,শুরুতেই এক এক করে সবার কাছ থেকে আবারো অভিযোগের সত্যতা যাচাই করি আমরা।
আরো একবার অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ের পর এবার আমরা অপু কে বলি মাহবুব কে ফোন দিয়ে জানানোর জন্য যে তারা তার জন্য নিচে অপেক্ষা করতেছেন।
পুরো পরিবার কে নিয়ে আমরা অপেক্ষা করি মাহবুবের জন্য,এর মধ্যে আমরা প্রবাসী কল্যাণ মন্তণালয়ের বাহিরের কয়েকটি জায়গায় আমাদের গোপন ক্যামেরা স্থাপন করি,কয়েক মিনিট পরেই মন্ত্রণালয় থেকে নিচে আসেন মাহবুব।
মাহবুব তাদের কে পরামর্শ দেন তিনি আগে গিয়ে ওয়েজ আর্নাস কল্যাণ বোর্ড এর সহকারী পরিচালক সীমা রানী হালদার এর সাথে কথা বলবেন এবং তিনি কল দেয়ার পর তারা যেন সীমা রানী হালদারের অফিসে যান এবং বাবুল চৌধুরীর স্ত্রী সন্তান যেনো সীমা রানীর পা ধরে কান্না কাটি করে টাকা গুলো দেয়ার অনুরোধ করে।
ভুক্তভোগীর অভিযোগ শতভাগ প্রমাণিত হওয়ায় আমরা মাহবুবের ফোনের অপেক্ষা না করে সরাসরি প্রবেশ করি প্রবাসী কল্যাণ মন্তণালয়ের ভিতরে,মাহবুব রহমানের কাছে গিয়ে অভিযোগ সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি সরাসরি অস্বীকার করেন এবং তিনি নিজেই আমাদের কে সীমা রানী হালদারের অফিসে নিয়ে যান,সীমা রানীকে প্রথমে মৌখিক ভাবে জানালে তিনি অভিযোগ কে চ্যালেঞ্জ করেন,এর পর আমরা তাকে সকল অডিও ভিডিও প্রদর্শন করলে তিনি নিজের দায় অস্বীকার করেন এবং মাহবুব কে জিজ্ঞাসাবাদ করেন,জিজ্ঞাসাবাদে মাহবুব টাকা চাওয়ার বিষয়টি স্বীকার করেন। স্বীকারোক্তি দেয়ার সময় মন্ত্রণালয়ের বেশ কয়েকজন কর্মকর্তা কর্মচারী উপস্থিত ছিলেন।
অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ার পর অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে কি ব্যবস্থা নেয়া হবে তা জানতে চাই ওয়েজ আর্নাস কল্যাণ বোর্ড এর সহকারী পরিচালক মোঃ নাজমুল হক এর সাথে,তিনি আমাদের পরামর্শ দেন সকল তথ্য প্রমান সহ আমরা যেন ওয়েজ আর্নাস কল্যাণ বোর্ড এর মহাপরিচালক বরাবর একটি অভিযোগ পত্র জমা দেই।
তার পরামর্শ অনুযায়ী গত ২৯ ডিসেম্বর রবিবার আমরা সেই অভিযোগ পত্রটি জমা দেই,একই সাথে সেদিন উপসচিব মোঃ ইমরান আহমেদ এর সাথে দেখা করে তাকে অভিযোগ সম্পর্কে অবহিত করি,সাক্ষাৎকালে বাবুল চৌধুরির পুরো পরিবার উপস্থিত ছিলেন, ইমরান আহমেদ জানান: অভিযুক্তদের কোনো রকম ছাড় দেয়া হবেনা,তাদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্ত মূলক ব্যবস্থা নিবে মন্ত্রণালয়।
আমরা ইমরান আহমেদের কাছে জানতে চেয়েছিলাম সৌদি আরবে বৈধ কর্মী থাকার পরে ও কেন তিনি ওয়েজ আর্নাস কল্যাণ বোর্ড এর পক্ষ থেকে ৩ লক্ষ টাকা পাচ্ছেন না,তিনি জানান এই ক্ষতিপূরণের টাকা দাবি করতে অবশ্যই ম্যানপাওয়ার থাকতে হয়,সহজ করে বললে উক্ত কর্মি যে কাজের ভিসা বৈধভাবে প্রবাসে গিয়েছেন সেটি প্রমান করে এই ম্যানপাওয়ার কার্ড,যেটি কারো কাছে বিএমইটি স্মার্ট কার্ড আবার কারো কাছে প্রবাসী কল্যাণ কার্ড নাম ও পরিচিত। কিন্তু যারা এই কার্ড প্রদানের পূর্বে প্রবাসে গিয়েছেন তাদের পাসপোর্টে একটি সিল থাকতো যেটি ম্যানপাওয়ার কার্ড হিসেবে বিবেচিত হয়,বাবুল চৌধুরির বিএমইটি স্মার্ট কার্ড ,প্রবাসী কল্যাণ কার্ড কোনোটাই ছিলোনা,সেক্ষেত্রে পুরোনো যেই পাসপোর্ট টি বাধ্যতামূলক,সেটি না থাকায় তিনি টাকাটি পাচ্ছেন না।
গত ৫ জানুয়ারী আমরা ইমরান আহমেদ কে ফোন করে জানতে চাই মাহবুবুর রহমান ও সীমা রানী হালদারের বিরুদ্ধে মন্ত্রণালয় কি ব্যবস্থা নিয়েছে,তিনি আমাদের জানান,অভিযোগ পত্র জমার দিন থেকে মাহবুবুর রহমান কে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে,সেই সাথে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। তিনি আশস্থ করেন অভিযোগ প্রমাণিত হবে এবং মাহবুব স্থায়ী বরখাস্ত হবেন।
১৪ দিন পর ১৯ জানুয়ারী ২০২৫ ওয়েজ আর্নাস কল্যাণ বোর্ড এর সহকারী পরিচালক মোঃ নাজমুল হক সাতকাহন নিউজকে জানান:মাহবুবুর রহমানের বিরুদ্ধে আনিত অভিযোগে প্রাথমিক ভাবে সত্য প্রমান হওয়ায় তাকে সাময়িক বরখাস্ত করেছে ওয়েজ আর্নাস কল্যাণ বোর্ড।
তিনি আরো জানান, অভিযোগ সঠিক ভাবে পর্যালোচনা করার জন্য তদন্ত কমিটির তদন্ত কার্য চলমান রয়েছে,তর্দন্ত রিপোর্ট পাওয়ার পর চূড়ান্ত সিদ্বান্ত নেয়া হবে।





